তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব।

নিজে সফল না হলেও পুরো ভারতবর্ষকে দেখিয়েছেন কীভাবে সফল হতে হয়, কীভাবে স্বাধীনতা আনতে হয়। সাহসিকতার সাথে উচ্চারণ করেছেন – তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব।

কলেজে পড়ার সময় ওটেন নামক জনৈক ইংরেজ অধ্যাপক ক্লাসে বাঙালি জাতি সম্পর্কে অপমানজনক উক্তি করে। এই অপমান সহজে মানতে পারেন নি তিনি। ক্লাস শেষেই ইংরেজ অধ্যাপক ওটেনকে মারধর করেন নেতাজি। তখন থেকেই তিনি বুঝেছেন ইংরেজ তাড়াইতে হলে মাইরের উপর ঔষুধ নাই!

ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস আই সি এস পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অধিকার করেও চাকরিতে যোগদান করেন নি গান্ধীজীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে। তখন সারা ভারতবর্ষে গান্ধীজীর নেতৃত্বে অসহযোগ-অহিংস এবং খিলাফত আন্দোলন তুঙ্গে।

১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে গান্ধীজীর অহিংস আন্দোলনের উপর আর আস্থা রাখতে পারেন নি নেতাজি। নেতাজির মত ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সারা দেশে আইন অমান্য করে স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে। কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সাথে মতবিরোধ দেখা দিলে নেতাজি অল ইন্ডিয়া কংগ্রেসের সভাপতি পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ততদিনে সারা দেশে নেতাজির জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। কবি গুরু রবি ঠাকুর নেতাজিকে দেশনায়ক উপাধিতে ভূষিত করলেন। নেতাজি সারাদেশ চষে বেড়াতে লাগলেন। বিভিন্ন স্থানে ইংরেজদের উপর হামলা, অগ্নিসংযোগ শুরু হল।

ইংরেজ সরকার নেতাজিকে বন্দি করে। কিন্তু ১৯৪১ সালের ২৬ জানুয়ারি তিনি সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে গোপনে কলকাতা ছেড়ে ভারত সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কাবুল হয়ে রাশিয়া চলে যান। রাশিয়া থেকে নেতাজি বার্লিনে পৌঁছান। বার্লিনে বেতার কেন্দ্র স্থাপন করেন। সেই বেতার কেন্দ্র থেকে ভারতবর্ষের বিভিন্ন ভাষায় প্রচার চালাতে থাকেন। দেশের মানুষ প্রতিদিন রেডিওতে প্রিয় নেতার কণ্ঠস্বর শুনে আরও আবেগ আপ্লুত হয়ে ব্রিটিশদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

এদিকে কংগ্রেস সুভাষের প্রতি মানুষের উত্তাল আবেগ দেখে অহিংস-অসহযোগ নীতি ত্যাগ করতে বাধ্য হল। গান্ধীজীর নেতৃত্বে শুরু হলো “ভারত-ছাড়ো” আন্দোলন। নেতাজি রেডিওতে ভাষণ দিয়ে দেশবাসীকে গান্ধীজীর নেতৃত্বে ভারত-ছাড়ো আন্দোলন সফল করার আহ্বান জানান। ইংরেজ তখন দিশেহারা। একদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রনাঙ্গনে ইংরেজদের শোচনীয় অবস্থা, আরেকদিকে ভারতবর্ষে চলছে তীব্র আন্দোলন। যুদ্ধের মধ্যে ভারতকে স্বাধীনতা দিলে শোষণ করার মত আর কিছু থাকবে না ইংরেজদের, অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়বে এবং যুদ্ধে হার নিশ্চিত। আন্দোলন স্তিমিত করার জন্য কংগ্রেসের সব নেতাকে বন্দি করে জেলের ভিতরে রাখা হল!

দেশের বাহির থেকে লড়াই জারি রাখলেন নেতাজি। এই দিকে জাপানের আক্রমণে সিঙ্গাপুরের পতন ঘটলে ৩২ হাজার ভারতীয় সৈন্যকে জাপানীদের হাতে ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে যায় ইংরেজ সেনাপতি। কিন্তু জাপানিরা ৩২ হাজার ভারতীয় সৈন্যকে বন্দি করে নি। ৩২ হাজার সৈন্য নিয়ে নেতাজি গড়ে তোলেন “আজাদ হিন্দ ফৌজ”।

নেতাজি তাঁর বাহিনী নিয়ে ১৯৪৪ সালে ভারতের মণিপুরে প্রবেশ করেন। ইংরেজরা তখন ভীত সন্ত্রস্ত। কিন্তু জাপান সরকার বিশ্বাসঘাতকতা করে সুভাষ বসুর সাথে। জাপান চাইছিল ভারত তাদের অধিকারে থাকুক কিন্তু নেতাজি চাইলেন ইংরেজ তাড়ানোর পর ভারত একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হবে। জাপানের ভারত দখলের মনোবাসনার কারণে নেতাজি আর বেশিদূর আগাতে পারেন নি।

মূলত নেতাজি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অক্ষশক্তি জাপান এবং জার্মানির সহায়তায় ভারত থেকে ইংরেজ তাড়ানোর প্রতিজ্ঞা করেন। হিটলার নেতাজিকে বার্লিনে রেডিও স্টেশন স্থাপন করতে সহায়তা করে এবং উন্নত অস্ত্রশস্ত্র দানের প্রতিশ্রুতি দেয়। বরাবরই হিটলারকে বদ্ধ উন্মাদ মনে করতেন নেতাজি। নেতাজির আসল উদ্দেশ্য ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিভিন্ন রনাঙ্গনে অক্ষশক্তির সুবিধা কাজে লাগিয়ে যে কোন মূল্য ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তি। জাপানের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে সেই স্বপ্ন ব্যর্থ হয় প্রাথমিকভাবে।

কিন্তু স্বাধীনতার স্বপ্নের বীজটা নেতাজিই বুনে দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ রাজশক্তির প্রচণ্ড দমন নীতির আঘাতে মথিত বাঙালি সমাজে আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটান নেতাজি সুভাষ বসু। ভিক্ষায় কোনদিন স্বাধীনতা আসে না, আসে রক্তের বিনিময়ে, এটাই ছিল নেতাজির শিক্ষা। তিনি চেয়েছেন পূর্ণ স্বাধীনতা, না স্বরাজ, না ডোমিনিয়ান স্ট্যাটাস। সেদিন নেতাজি বলেছিলেন – গিভ মি ব্লাড, আই উইল গিভ ইউ ফ্রিডম।

মানুষের মুক্তির স্বাধীনতা সংগ্রামের সূর্যসন্তান এই মহান বাঙালি ১৮৯৭ সালের আজকের এই দিনে জন্মগ্রহণ করেন। শুভ জন্মদিন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।

মন্তব্যসমূহ

Times24

শুধু মেডামের জন্য এখনো রাজনীতি করছি,তারেকের অধীনে রাজনীতি করার প্রশ্নই আসেনা

বাঁশখালীতে আ'লীগের চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে জামায়াত শিবির

৭ই মার্চ স্মরণে চঃদ জেলা ছাত্রলীগের মিছিল ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

লিটন ভাইয়ের বিকল্ব কেবল লিটন ভাই